মনোরম সৌন্দর্যে ভরপুর অসংখ্য দ্বীপ ছড়িয়ে আছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। অধিকাংশ দ্বীপ তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়। তবে সারা বিশ্বে এমন অদ্ভুত কিছু দ্বীপ রয়েছে, যেখানে অপার্থিব সৌন্দর্য্যের পাশাপাশি লুকিয়ে আছে মৃত্যুর হাতছানি। ব্রাজিলের স্নেক আইল্যান্ড তেমনই একটি রহস্যময় দ্বীপ যেখানে প্রতি বর্গ মিটারে কয়েকস্তরে এক থেকে পাঁচটি সাপ বাস করে । পৃথিবীর সবচেয়ে বিষাক্ত সাপেরা বাস করে এই দ্বীপে এবং তাদের বিষ এতটাই মারাত্মক যে মানুষের মাংস পর্যন্ত গলিয়ে দিতে পারে। তো চলুন জেনে নেয়া যাক ভয়ংকর এই দ্বীপ সম্পর্কে ।
ব্রাজিলের সাও
পাওলো থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে রয়েছে একটি দ্বীপ যেটির নাম ইলহা দ্য
কুয়েইমাডা গ্র্যান্ডে, যেখানে বাস করে
বিশ্বের সবচেয়ে বিষধর সাপেরা। আর এই দ্বীপটিতে সাপের সংখ্যা এত বেশি যে, সেখানে পা দেওয়া মানেই বিষধর সাপদের মুখোমুখি
হওয়া। আর একারণেই এই দ্বীপের নাম Snake Island বা সাপের দ্বীপ ।
৪ লাখ ৩০ হাজার
বর্গমিটারের এই ভয়ানক দ্বীপটিতে অন্যান্য প্রজাতির সাপের সঙ্গে
রয়েছে কয়েক লক্ষ গোল্ডেন লাঞ্চহেড ভাইপার সাপ। এগুলো বিশ্বের সবচেয়ে বিষাক্ত সাপের অন্যতম।
এমনকি এ সাপ দংশনের পর ওষুধেও কোনো কাজ হয় না, মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে
মানুষ।
ইলহা দ্য
কুয়েইমাডা গ্র্যান্ডে। নামটা যেমন অদ্ভুত, তেমনই রহস্যে মোড়া এই দ্বীপ।
দ্বীপটিকে নিয়ে
কয়েকটি গল্প প্রচলিত রয়েছে। সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন এক মত্স্যজীবী। খিদে
পাওয়ায় খাবারের খোঁজে দ্বীপে প্রবেশ করেছিলেন লোকটি। পরেরদিন নাকি তাঁর রক্তাক্ত দেহ পাওয়া যায়।
এই ঘটনার পর
মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়ে এবং ‘ওই দ্বীপে গেলে জীবন্ত কেউ ফেরে না’ এই ধারণাটা আরও চেপে বসে তাঁদের মধ্যে।
জাহাজের
যাতায়াতের সুবিধার জন্য ১৯০৯ সালে এই দ্বীপটিতে একটি লাইট হাউস বা বাতিঘর তৈরি করা হয়েছিল । লাইটহাউস রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি পরিবার ওই
দ্বীপে বেশ কয়েক বছর থাকতেন। ১৯০৯-’২০ পর্যন্ত ছিলেন তাঁরা। শোনা যায়, ঘরে ঢুকে পুরো পরিবারকে মেরে ফেলে সাপের দল।
তবে সত্য-মিথ্যা
যাই হোক না কেন, এ দ্বীপটি ১৯২০ সালের পর থেকে জনসাধারণের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে ব্রাজিলের
নৌবাহিনী।
স্থানীয় জেলেরা
জানান, এ দ্বীপে যারা বিভিন্ন কারণে পদার্পণ করেছে, তাদের কেউই ফিরে আসেনি।
কোথা থেকে এল এই
সাপ? এ নিয়েও আছে কল্প-কাহিনি। শোনা যায়, জলদস্যুরা তাদের লুঠ করা সোনা এই দ্বীপে লুকিয়ে
রাখত। কেউ যাতে সেগুলোতে হাত দিতে না পারে সে জন্য কয়েকটি বিষাক্ত সাপ নিয়ে
এসে দ্বীপে ছেড়ে দিয়েছিল তারাই। সেই সোনার লোভে বারেবারেই সেখানে গিয়েছে মানুষ।
কিন্তু জানা যায়, তারা কেউই বেঁচে ফেরেনি।
তার পর সেই সাপের
বংশবৃদ্ধি হতে থাকে। কয়েকটি সাপ থেকে কয়েক লাখ সাপে ভরে যায় গোটা দ্বীপ।
বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, খোঁজ নিয়ে দেখা
গিয়েছে ওই সাপ গোল্ডেন ল্যান্সহেড ভাইপার। বিশ্বের অন্যতম বিষধর সাপ এটি।
সাধারণ বিষধর
সাপের চেয়ে এই সাপ কয়েকগুণ বেশি বিষধর হয়ে থাকে। এই প্রজাতির সাপগুলো দেখতে
উজ্জ্বল হলুদাভ বাদামি বর্ণের। এগুলো গড়ে ২৮ ইঞ্চি থেকে সর্বোচ্চ ৪৬ ইঞ্চি পর্যন্ত
লম্বা হয়ে থাকে। এদের মাথা অন্যান্য সাধারণ সাপের তুলনায় বেশ তীক্ষ্ণ হয়ে থাকে।
খাদ্যের প্রসঙ্গে বলতে গেলে এসব সাপ আকাশে উড়ন্ত পাখিকেও মূহূর্তেই ছো মেড়ে কাবু
করে নিজের খাবার হিসেবে গ্রহণ করে ৷ এছাড়া টিকটিকি এবং অন্যান্য সাপও থাকে এদের
প্রতিদিনের খাদ্য-তালিকায়। এদের বিষ এতই ভয়ানক যে, এই বিষ দিয়ে মুহূর্তেই মানুষের মাংসকে গলিয়ে
ফেলা সম্ভব। সাধারণত এই সাপের বিষ মানুষের শরীরে প্রবেশ করার মাত্র ৩০ মিনিটের
মধ্যেই মানুষটি মারা যায়। তাই যাবতীয় হিংস্রতার কথা বিবেচনা করে এই দ্বীপটিতে জন-সাধারণের
চলাচল নিষিদ্ধ করে ব্রাজিল সরকার।
একটি সমীক্ষায়
দেখা গিয়েছে, সাপের সংখ্যা এত বেড়ে গিয়েছে যে, প্রতি বর্গ মিটারে কয়েকস্তরে এক থেকে পাঁচটি সাপ বাস করে। সাপদের স্বর্গরাজ্য এই দ্বীপটিকে তাই ‘স্নেক আইল্যান্ড’ বলা হয়।
গোল্ডেন
ল্যান্সহেড যেহেতু বিরল প্রজাতির, তাই এই সাপকে বাঁচাতে ব্রাজিল সরকার পদক্ষেপ গ্রহন করেছে। বিশ্ববাজারে এই
সাপের চাহিদা থাকায় চোরা কারবারিদের হাতে থেকে রক্ষা করতে এবং সাপের কামড়ে যাতে
মৃত্যু না হয় সেজন্য সাধারণ মানুষের দ্বীপে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

