ধ্বংস হয়ে যাওয়া
পম্পেই নগরীর নামটি হয়তো অনেকেরই জানা!
ইতালিতে অবস্থিত এটি এমন এক নগরী যেটি ধ্বংস হওয়ার সময় সেখানকার মানুষ চোখের পলক
ফেলার সময়টুকু পায়নি। মুহূর্তেই মানুষগুলো ভস্মে পরিণত হয়েছিল।
ইতালির
কাম্পানিয়া অঞ্চলের নেপলসের (নাপোলি) কাছে যে আগ্নেয়গিরি রয়েছে তার পাদদেশে
"পম্পেই" নামক ছোট এ নগরীটি অবস্থিত। প্রাচীন গ্রিকরা খ্রীস্টাব্দ ৮
সালের দিকে এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। সে সময় বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ পম্পেই
শহরে আসত বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে। এটি ব্যবহার হত বাণিজ্যিক বন্দর হিসেবে। শহরটির
এক পাশে রয়েছে সমুদ্র, অপর দিকে সবুজ ভিসুভিয়াস পাহাড় ও বিশাল আকাশ। তৎকালীন সময়ের রোমের
বিশিষ্ট নাগরিকদের জন্য একটি সমৃদ্ধ আশ্রয়স্থল ছিল এ নগরীটি। মার্জিত ঘর এবং
বিস্তৃত পাকা রাস্তা, অবাধ যৌনতা,
পতিতালয় এসব কোনো কিছুর
অভাব ছিল না এ নগরীতে। প্রাচীন গ্রীক, রোমসহ বিভিন্ন দেশের নাবিকদের অবাধ চলাচল ছিল এই নগরীতে।
তাদের সন্তুষ্টির
জন্য ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা থেকে সুন্দরী রমনীদের আনা হত। এই
স্থানের অন্যতম বড় ব্যবসা ছিল দেহ ব্যবসা। বাণিজ্যিক টুরিস্টদের জন্য সেখানে গড়ে
উঠেছিল অত্যাধুনিক দৃষ্টিনন্দন অট্টালিকা প্রাসাদ, বাজার ইত্যাদি। শহরটি ধীরে ধীরে প্রাচীন কালের
আধুনিক সভ্যতার সকল ধরনের চিত্তরঞ্জনের জন্য প্রাণবন্ত একটি শহরে পরিণত হয়ে উঠে।
তৎকালীন অভিজাত মানুষগুলোর আমোদপ্রমোদের কেন্দ্রস্থল ছিল এই নগরী। রোমের সব
সম্পদশালী মানুষের অবসর কাটানোর শহর ছিল এই পম্পেই। কিন্তু প্রকৃতির এত সম্পদ
পাওয়ার পরও ধীরে ধীরে প্রকৃতির নিদর্শনকে অস্বীকার করে পাপাচারে লিপ্ত হয়ে পড়ে
পম্পেইবাসী। এরা যৌনতায় এতই অন্ধ ছিল যে, বাড়ির গৃহকর্তা
নিজের ছেলে-মেয়েদের দিয়ে অতিথির যৌন বিনোদনের ব্যবস্থা করতে দ্বিধা করত না। এমনকি
পশু-পাখি দিয়েও নিজেদের যৌন বিকৃতির পিপাসা মেটাতো । তাদের এসব কর্মকান্ড হয়ত প্রকৃতিও সহ্য করতে
পারেনি। সেখানকার প্রতিটি মানুষ,
পশুপাখি সহ সকল জীবন্ত
প্রাণের স্পন্দন চোখের পলকে ভষ্মীভূত হয়ে যায়।
খৃস্টাব্দ ৭৯
সালের ২৪শে আগস্ট। দুপুরবেলা ইতালির পম্পেই শহরের অধিবাসীরা কেউ বিশ্রামে ব্যাস্ত
ছিল, আবার কেউ আনন্দ-উদ্দীপনায়
নিজেদের মত্ত রেখেছিল। ঠিক সেই সময় হঠাৎ করে শহরের পাশে অবস্থিত ভেসুভিয়াস পর্বতে
কোন প্রকার পূর্বসংকেত ছাড়াই এক বিরাট ধরনের ক্যাটাস্ট্রোফিক অগ্নুৎপাত ঘটে।
সাধারণত কোন অঞ্চলে আগ্নুৎপাত হবার কিছুক্ষণ আগে ঐ অঞ্চলের পশুপাখির আচরণের মধ্যে
একধরনের পূর্বসংকেত লক্ষ্য করা যায়। পম্পেই শহরের ক্ষেত্রে তার কিছুই পাওয়া যায়নি
বলে ঐতিহাসিকরা বর্ণনা করেছে। ফলে পম্পেই শহরের ২০ হাজার অধিবাসী দিনে দুপুরে
মাত্র অল্প কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ২০ ফুট আগ্নিয় লাভা আর ছাইভষ্মের নিচে বিলীন
হয়ে যায়। শহরের সমস্ত মানুষ, প্রাণী ও
উদ্ভিদরাজীর তাৎক্ষণিক জীবন্ত কবর রচিত হয়। তারপর থেকে প্রকৃতির অভিশপ্ত এবং
পাপিষ্ঠ শহর হিসেবে এই শহর প্রায় ১৭০০ বছর ধরে আধুনিক মানব সভ্যতার অগোচরে থেকে যায়।
কেউ কখনও সেখানে ভুল করেও প্রবেশ করেনি
কিছু এ্যামেচার
আর্কিওলজিস্ট খৃস্টাব্দ ১৭৪৯ সালে সর্বপ্রথম আবিস্কার করেন ধ্বংস হয়ে যাওয়া
পম্পেই। তারপর থেকে সেখানে উৎসাহী মানুষের আনাগোনা বাড়তে শুরু করে। ইতোমধ্যে প্রায়
দুই হাজার বছর সময়ে শহরটি কয়েক হাজার ফুট মাটির নিচে বিলীন হয়ে গেছে। আশ্চার্যের
বিষয় হচ্ছে এখনও সেই মাটি আর ছাইভষ্মের নিচ থেকে প্রাণীসহ মানুষের মৃতদেহ অবিকল
ফ্রোজেন অবস্থায় সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে। মৃত্যুর সময় যে যেভাবে অবস্থান করছিল
তাকে সেভাবেই পাওয়া যাচ্ছে।
আবিষ্কৃত এই
শহরের প্রতœতাত্ত্বিক
খননকার্য ইতিহাসে বিস্ময়কর। কারণ এখানকার মতো পৃথিবীর অন্য কোথাও খননকার্যে
প্রাচীনকালের সভ্যতা, তৎকালীন মানুষের
দৈনন্দিন জীবনধারা এমনভাবে মূর্ত হয়ে ওঠেনি। এই শহরে প্রবেশ করলে মনে হয়, এখানে যেন সেই দুহাজার বছর আগেকার জীবনধারার
অবলুপ্তি ঘটেনি; বরং তা কোনো
বিপর্যয়ের মুহূর্তে হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। সে জীবনধারা যেন হঠাৎ বন্দী হয়ে গেছে
সময়ের ক্যাপসুলে।
পম্পেই শহরের সেই
রাস্তাগুলো, বাসভবন এবং
সুদৃশ্য বিপণিমালা, সরাইখানা ও
ব্যবসা কেন্দ্রগুলো আবার লোকচক্ষুর গোচর হচ্ছে হাজার বছর পর। সেখানকার খাবার ঘর,
তার আসবাবপত্র, শোবার ঘর এবং বিছানাপত্র, বিছানার পাশে ছোট্ট টেবিল, রান্না করার উনুন, তার উপর বসানো রান্নার পত্র, পান্থ নিবাস এবং তার দেয়ালে আগন্তুকদের হাতে
লেখা মন্তব্য সবই নীরব অতীতের সাক্ষ্য দেয়। শুধু তাই নয়, পম্পেইর দেয়ালগাত্রে এখনো জেগে আছে তখনকার
নির্বাচনের খবর, বালক-বালিকাদের
বিদ্যাচর্চার পরিচয় এবং পেশাদার যোদ্ধাদের মানুষ অথবা জন্তুর সঙ্গে লড়াইয়ের ঘোষণা।
মোটেও অসুবিধা হয়নি, এসব লিপির
পাঠোদ্ধার করতে। কারণ তা সবই ছিল ল্যাটিন ভাষায়। আর ধনী লোকদের বাড়ির প্রাচীর
গাত্রে অঙ্কিত আছে তখনকার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ছবি। পম্পেই রাস্তা দিয়ে এখন যদি আমরা হেঁটে যাই, তাহলে মনে হবে আমরা যেন সেই দুহাজার বছরের আগের
শহরে ফিরে গেছি। তখনকার অধিবাসীদের জীবনযাত্রা প্রত্যক্ষ দেখতে পাচ্ছি। কারণ
খননকার্য অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে করা হয়েছে। প্রত্যেকটি জিনিস যেখানে ছিল তা
সেখানে রাখার জন্য করা হয়েছে বিপুল প্রয়াস।
প্রকৃতি তার অমোঘ
নৈপুণ্য আর বৈজ্ঞানিক উপকরণ দিয়ে এই সব মৃতদেহকে বছরের পর বছর মাটির নীচে স্বযত্নে সংরক্ষণ করেছে যা
আমাদের মত সাধারন মানুষের জ্ঞানে অবিশ্বাস্য। এই সব প্রাণী ও মানুষের মৃতদেহ দিয়ে
ইতালির সরকার নতুন করে তাদের ঐতিহাসিক যাদুঘর সাজাচ্ছে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে। এখন
এই স্থানে জাতিসঙ্ঘের তথ্য অনুযায়ী বছরে প্রায় ২৫ মিলিয়ন টুরিস্ট ভ্রমণ করে।
