করোনা ভাইরাস থেকে কবে মুক্তি মিলবে তার কোন সুস্পষ্ট ধারণা
কেউ দিতে পারছেন না। কিন্তু করোনাভাইরাস পরবর্তী বিশ্ব সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ এবং ভবষ্যৎদ্রষ্টাগণ মনে করছেন যে, পৃথিবী আর আগের মতো নেই। গত কয়েক মাসে যা
ঘটেছে, তার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।
এই মহামারির পর
পাল্টে যাবে আমাদের কাজ-প্রাত্যহিক জীবন-ভ্রমন-বিনোদন থেকে শুরু করে
ব্যবসা-বাণিজ্য-অর্থনীতি-রাষ্ট্র-সমাজ সবকিছু।
রাজনীতি:
বিশেষজ্ঞরা মনে
করছেন, এই মহামারী শেষে বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ব্যাবস্থায় ব্যাপক
পরিবর্তন ঘটবে, জনগণের উপর সরকারের নজরদারি বেড়ে যাবে , যেখানে সরকার প্রতিটি নাগরিকের প্রতিটি
মূহুর্তের চলা-ফেরা শুধু নয়, তার আবেগ-অনুভূতি, পছন্দ-অপছন্দের খবরও জেনে যাবে।
এটা শুরু হবে
মহামারি মোকাবেলার নামে মানুষের চামড়ার নীচে কোন মাইক্রোচিপ ঢুকিয়ে দিয়ে বা
ট্র্যাকিং এর জন্য হাতে বেড়ি পরিয়ে। সরকার হয়তো বলবে, যারা নিয়ম ভাঙ্গবে তাদের শাস্তির জন্য এই
ব্যবস্থা। কিন্তু বাস্তবে এটি পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারিতে কাজে
লাগবে।
মহামারি ঠেকানোর
নামে কিছু কিছু দেশ এরই মধ্যে এরকম কাজ শুরু করে দিয়েছে। ইতিমধ্যে চীনে সব
মানুষের স্মার্টফোন মনিটর করা হচ্ছে। চেহারা চিনতে পারে এরকম লাখ লাখ ক্যামেরা
দিয়েও নজর রাখা হচ্ছে মানুষের ওপর।কিন্তু পরের ধাপে এই নজরদারি চলে যেতে পারে আরও
নিবিড় পর্যায়ে।
অর্থনীতি : ভয়াবহ বিশ্বমন্দা
করোনাভাইরাস
মহামারি পরবর্তী বিশ্বে অর্থনীতির অবস্থা কী দাঁড়াবে, সেটা নিয়েই সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা। অনেকের
ধারণা, মহামারি হয়তো
নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে, কিন্তু এটা করতে
গিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির যে মারাত্মক ক্ষতি এর মধ্যে হয়ে গেছে, তা কাটাতে বহু বছর লেগে যাবে।
মার্চের প্রথম
সপ্তাহ থেকে বিশ্বের প্রায় সব প্রধান অর্থনীতিতে বিরাট ধস নেমেছে, যেটাকে বলা হচ্ছে ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের
চাইতেও ভয়াবহ। কেউ কেউ বলছে ১৯৩০ এর দশকে যে বিশ্ব মহামন্দার সূচনা হয়েছিল,
এবারের অর্থনৈতিক সংকট
সেটাকেও ছাড়িয়ে যাবে।
করোনাভাইরাসের
বিশ্ব মহামারি শুরু হওয়ার পর এবারের অর্থনৈতিক ধসটা ঘটেছে মাত্র তিন সপ্তাহের
মধ্যে।
সামনের দিনগুলোতে
বিশ্ব অর্থনীতির কী দশা হবে, তার ভয়ংকর সব
পূর্বাভাস এরই মধ্যে আসতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক মূদ্রা তহবিল বা আইএমএফ এরই
মধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে ১৯৩০ এর দশকের বিশ্বমন্দার পর এরকম খারাপ অবস্থায় আর
বিশ্ব অর্থনীতি পড়েনি।
কাজ-বিনোদন-ভ্রমণ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন,
লকডাউন থাকুক বা উঠে যাক,
আমরা যেভাবে চলি,
শপিং করি, খেতে যাই, বেড়াতে যাই, কাজ করি, পড়াশোনা করি- এই সমস্ত কিছুই আমূল বদলে দিতে
যাচ্ছে করোনাভাইরাস।
কিছু পরিবর্তন
এরই মধ্যে ঘটে গেছে। বিশ্বের বহু মানুষ এখন ঘরে বসেই কাজ করছেন। প্রযুক্তি খুব সহজ
করে দিয়েছে ব্যাপারটি। অনেক স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয় তাদের পাঠদান করছে অনলাইনে।
করোনাভাইরাসে
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ একটি খাত হচ্ছে বিমান চলাচল এবং পর্যটন। বিশেষজ্ঞদের ধারণা,
মহামারি দীর্ঘস্থায়ী হলে
এবং করোনাভাইরাসের টিকা আবিস্কার বিলম্বিত হলে, এই দুটি খাতের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে। তার
মানে কাজ বা বিনোদনের জন্য যে ধরণের বাধাবিঘ্নহীন ভ্রমণে এখন মানুষ অভ্যস্ত তা
অনেক পাল্টে যাবে। বিমান ভ্রমণ অনেক ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়াবে। আন্তর্জাতিক পর্যটন
ধসে পড়বে।
গুরুত্ব বাড়বে
রোবটের:
শিল্প-কারখানায়
উৎপাদনকাজে ক্রমেই রোবটের ব্যবহার বাড়ছে। ধীরে ধীরে যন্ত্রের দখলে চলে যাচ্ছে
শ্রমবাজার। আর এবার করোনার প্রাদুর্ভাবে আরও প্রকট আকার দেখা দিচ্ছে। কারণ
মানবকর্মীর কারণে বন্ধ রাখতে হচ্ছে কলকারখানা। এদিক থেকে রোবটের কাছে হেরে যাচ্ছে
মানুষ। তাই মানবশ্রমিকের প্রয়োজন ফুরিয়ে যেতে বসেছে। ২০২৫ সালের মধ্যে শ্রমবাজারের
৫২ ভাগই চলে যাবে রোবটের দখলে।
বাড়বে বেকারত্ব:
করোনার কারণে
পুরো বিশ্বে নেমে এসেছে অর্থনৈতিক ধস। প্রতিনিয়তই দেশে দেশে বাতিল হচ্ছে
কলকারখানার অর্ডার। সবকিছু কবে স্বাভাবিক হবে সে বিষয়ে কেউ কিছু জানে না।
করোনা-পরবর্তী সময়ে বড় বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো নতুনভাবে শুরু করতে পারলেও ছোট
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেতে পারে চিরতরে। এতে চাকরি হারাবে কোটি কোটি মানুষ।
করোনা প্রাদুর্ভাবের ফলে যে বেকারত্ব তৈরি হবে, এতে কত লোক যে বেকার হবে সেটা এখনো স্পষ্ট নয়।
